রবিবার ২৯শে জানুয়ারি, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ | ১৫ই মাঘ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম
শিরোনাম
রামুতে পানিতে ডুবে দুই কন্যা শিশুর মৃত্যু!

পিতা-মাতার কান্না থামছেনা সাত মাসেও

নেছার আহমদ   |   বুধবার, ৩০ নভেম্বর ২০২২

পিতা-মাতার কান্না থামছেনা সাত মাসেও

সন্তানহারা আব্দুল করিম-সাবেকুন্নাহার দম্পতি

রামুর বাঁকখালী নদীর পানিতে ডুবে মৃত্যু হওয়া দুই কন্যা শিশুর পিতা-মাতার কান্না থামছেনা। দুই কন্যার কথা মনে করলেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন মা সাবেকুন্নাহার। পিতা আব্দুল করিম বিলাপ আর কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। সারা জীবনের জন্য কান্নায় ছেড়ে গেলো নাড়ী ছেড়া সন্তানরা। পিতা-মাতাকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে দু’কন্যা না ফেরার দেশে চলে যাবেন ভাবেননি কখনও। তাইতো কান্না আর বুক ফাটা আর্তনাদ বন্ধ হচ্ছে না পিতা-মাতার। বিদ্যালয়ের সহপাঠী, শিক্ষক, প্রতিবেশিরাও ভুলতে পারছেননা পানিতে ডুবে জীবন প্রদীপ নিভে যাওয়া দু’শিশু তাশফিয়া নুর জোফা ও জান্নাতুল মাওয়া মিষ্টির কথা।

মা বাবার আশা ছিল দু’কন্যা লেখা পড়া করে অনেক বড় হবে। গড়বে নিজেদের সুন্দর জীবন। কিন্তু তাদের সব লালিত স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেলো। গত ২২ এপ্রিল (২০ রমজান, শুক্রবার) সকাল ১০ টায় বহমান বাঁকখালী নদীর পানিতে খেলতে নেমে জ্বলে ওঠার আগেই নিভে গেল দুই বোন ৯ বছর বয়সের তাশফিয়া নুর জোফা ও ৫ বছর বয়সের জান্নাতুল মাওয়া মিষ্টির জীবন প্রদীপ। অসচেতনতার কারনে আর যেন কোন মা-বাবার বুকের ধন অকালে হারিয়ে না যায় তার জন্য সচেতনতা বৃদ্ধির তাগিদ সকলের। পাশাপাশি শিশুদের সাতার শেখানোর উপরও গুরাত্বারুপ করেন অনেকে।

কক্সবাজারের রামু উপজেলার ফতেখারকুল ইউনিয়নের খন্দকারপাড়ায় আব্দুল করিম ও সাবেকুন্নাহার দম্পতির টিনের বেড়া ও ছাউনির দুচালা ঘর। বাড়ীর পাশেই বহমান বাঁকখালী নদী। আব্দুল করিম দিনমজুর এবং সাবেকুন্নাহার গৃহীনি। তাদের সংসারে দু’শিশু কন্যা ৯ বছর বয়সের তাশফিয়া নুর জোফা ও ৫ বছর বয়সের জান্নাতুল মাওয়া মিষ্টিকে নিয়ে অনেক ম্বপ্ন ছিল। তাশফিয়া নুর জোফা রামু কেন্দ্রীয় সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৩য় শ্রেণিতে ও জান্নাতুল মাওয়া মিষ্টি একই বিদ্যালয়ে প্রাক প্রাথমিকে পড়ালেখা করত। কিন্তুগত ২২ এপ্রিল দু’শিশু কণ্যা বাড়ীর পাশে নদীর পানিতে খেলতে নেমে তাদের মৃত্যু হয়। দুই কন্যা হারিয়ে ৭ মাস ধরে কান্না আর বুক ফাটা আর্তনাদ বন্ধ হচ্ছে না পিতা-মাতার।

পরিবারের দেয়া তথ্যমতে, ২০ রমজান, শুক্রবার সকালে পিতা আব্দুল করিম দিনমজুরীর কাজে ছিলেন। মা সাবেকুন্নাহার বাড়ীর পাশে কাপড় ধুতে ব্যস্ত ছিলেন। তাদের দুই মেয়ে তাশফিয়া নুর জোফা ও জান্নাতুল মাওয়া মিষ্টি অন্যান্য শিশুদের সাথে বাড়ীর পাশে খেলতে যান। ৭/৮ জন শিশু খেলা শেষে পাশের বাঁকখালী নদীতে গোসলে নেমে খেলা করছিল। নদী থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালি উত্তোলনের কারনে বেশ কিছু গর্ত তৈরী হয়। পানিতে খেলার এক পর্যায়ে সকাল ১০টার দিকে জান্নাতুল মাওয়া মিষ্টি নদীর গর্তে গভীর পানিতে পড়ে যায়। ছোট বোনকে বাঁচাতে গিয়ে তাশফিয়া নুর জোফাও গর্তে পড়ে যায়। অন্যান্য শিশুরা তাদের উদ্ধারের চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়। এতে অন্যান্য শিশুদের চিৎকারে স্থানিয়রা উদ্বারে গিয়েও ব্যর্থ হয়। আত্মিয় স্বজন সহ স্থানিয়রা এক ঘন্টা পর দু’বোনকে উদ্ধার করে রামু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষনা করেন।

সরেজমিনে বাড়িতে গিয়ে কথা হচ্ছিল আব্দুল করিম ও সাবেকুন্নাহার দম্পতির সাথে। দু’কন্যার কথা জানতে চাওয়া হলে কান্নায় জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন মা সাবেকুন্নাহার। প্রতিবেশিরা তার মাথায় পানি ঢেলে জ্ঞান ফিরান। আর দিনমজুরীর পিতা আব্দুল করিম কান্না ও বিলাপ করে বলেন, আশা ছিল দু’কন্যা লেখা পড়া করে অনেক বড় হবে। সুন্দর জীবন গড়বে। কিন্তু তাদের সব লালিত স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। পিতার কাধে সন্তানের লাশ যে কি কষ্টের সেটা প্রকাশ করা সম্ভব নয়। অসচেতনতার কারনে আর যেন কোন মা-বাবার বুকের ধন অকালে হারিয়ে না যায়।

রামু কেন্দ্রীয় সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মেঘনা রানী শর্মা বলেন, দুজনই এ স্কুলের শিক্ষার্থী। তাশফিয়া নুর জোফা তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ত। ৬২ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে তার রোল নং ছিল ১৭। মেধাবি ও শান্ত ছিল। জান্নাতুল মাওয়া মিষ্টি প্রাক প্রাথমিকে ভর্তি হয়েছিল। নামের সাথে সে ছিল খুবই মিষ্টি। কিন্তু নদীর পানিতে পড়ে এভাবে দু’বোনের অকাল মৃত্যু হবে ভাবইে কষ্ট হয়। গত ৫ বছরে তাদের মত মোট ৬ জন শিশু নদীর পানিতে পড়ে মৃত্যু হয়েছে। পনিতে পড়ে শিশু মৃত্যুর বিষয়ে অসচেতনতাই কারন হিসাবে মনে করে এ শিক্ষক বলেন, সচেতনতার পাশাপাশি কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। ইতিমধ্যে প্রতি মাসে বিদ্যালয়ে মা সমাবেশ করে সচেতনার তাগিদ দেয়া হচ্ছে।

রামু কেন্দ্রীয় সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে কথা হয় তাশফিয়া নুর জোফার সহপাঠি জহুরা ফাওজিয়া জামির সাথে। এ শিশু ভুলতে পারছেননা তার সহপাঠির কথা। এক সাথে বিদ্যালয়ে আসা যাওয়া ও খেলা করার কথা বলতেই কান্নায় চোখ মোছেন।

সচেতন মহলের দাবি, শিশুরা অবুঝঅবুঝ শিশুরা যাতে নদী, পুকুরের পাড়ে যেতে না পারে বা পানিতে না নামেন সে বিষয়ে অভিভাবকদের আরো সচেতন হতে হবে। এ বিষয়ে সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থাকে সচেতনতা বাড়ানোর উপর পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশে প্রতিদিন অন্তত ৫০ জন শিশু পানিতে ডুবে মারা যায় বলে তথ্য রয়েছে এ নিয়ে কাজ করা সোসাইটি ফর মিডিয়া এ্যান্ড সুইটাবেল হিউম্যান কমিউনিকেশন টেকনিকস (সমষ্টি) এর কাছে। সংস্থাটির করা এক জরিপের তথ্য অনুযায়ী, বছরে অন্তত ১২ হাজার শিশুর মৃত্যু হয় পানিতে ডুবে। কার্যত পানিতে ডুবে বিচ্ছিন্নভাবে মারা যায় বলেই এ নিয়ে আমাদের তেমন খবর থাকে না।

/টিআর/

Comments

comments

Posted ৩:৪০ অপরাহ্ণ | বুধবার, ৩০ নভেম্বর ২০২২

dbncox.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

এ বিভাগের আরও খবর

আর্কাইভ

প্রকাশক
তাহা ইয়াহিয়া
সম্পাদক
মোঃ আয়ুবুল ইসলাম
প্রধান কার্যালয়
প্রকাশক কর্তৃক প্রকাশিত এবং দেশবিদেশ অফসেট প্রিন্টার্স, শহীদ সরণী (শহীদ মিনারের বিপরীতে) কক্সবাজার থেকে মুদ্রিত
ফোন ও ফ্যাক্স
০৩৪১-৬৪১৮৮
বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন
01870-646060
Email
ajkerdeshbidesh@yahoo.com